গত ৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধরত দুই প্রতিবেশী দেশ রাশিয়া এবং ইউক্রেন তিন দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে। আজ ৯ মে থেকে আগামী ১১ মে পর্যন্ত থাকবে এই যুদ্ধবিরতি। শুক্রবার (৮ মে) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই যুদ্ধবিরতি শনিবার (৯ মে) থেকে সোমবার (১১ মে) পর্যন্ত স্থায়ী হবে।
যুদ্ধবিরতির এই তিন দিন যাবতীয় হামলা-পাল্টা হামলা বন্ধ রাখবে রাশিয়া এবং ইউক্রেন এবং দুই দেশের প্রত্যেকে ১ হাজার করে মোট ২ হাজার যুদ্ধবন্দিকে মুক্তি দেবে।
ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে রাশিয়া এবং ইউক্রেন আগামী তিন দিন (৯, ১০ এবং ১১ মে) যুদ্ধবিরতি পালন করবে। রাশিয়ায় এই উদযাপন বিজয় দিবস উপলক্ষে এবং একইভাবে ইউক্রেনেও; কারণ তারাও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি বড় অংশ হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিল।’
প্রসঙ্গত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন জয় করতে দেশটিতে প্রবেশ করেছিল জার্মানির তৎকালীন চ্যান্সেলর অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসী সেনাবাহিনী। তবে তারা ব্যর্থ হয় এবং ১৯৪৫ সালের ৮ মে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে আত্মসমর্পণ চুক্তি স্বাক্ষর করে। সেই থেকে ৮ মে-কে বিজয় দিবস হিসেবে উদযাপন করে রাশিয়া।
এর কিছুক্ষণ পরই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও ক্রেমলিন– উভয়পক্ষ তিন দিনের এই যুদ্ধবিরতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই সমঝোতা হয়েছে। রাশিয়া এর আগে শনিবার তাদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ‘বিজয় দিবস’ (৯ মে) উপলক্ষে এককভাবে দুই দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিল।
যুদ্ধবিরতির এই তিন দিনে পরস্পরকে লক্ষ্য করে সব ধরনের আক্রমণ রাশিয়া এবং ইউক্রেন বন্ধ রাখবে এবং প্রত্যেকে ১ হাজার করে যুদ্ধবন্দি মুক্তি দেবে— উল্লেখ করে ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আশা করছি, এই যুদ্ধবিরতি একটি অত্যন্ত দীর্ঘ, প্রাণঘাতী এবং কঠিন লড়াইয়ের অবসানের সূচনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটি সবচেয়ে বড় যুদ্ধ এবং এ যুদ্ধ শেষ করতে আমাদের আলোচনা অব্যাহত আছে। আমরা প্রতিদিন এই যুদ্ধ সমাপ্তির আরো কাছাকাছি আসছি। এ বিষয়ে মনোযোগের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।’
ট্রাম্প আরো বলেন, ‘আশা করি, এটি একটি অত্যন্ত দীর্ঘ, প্রাণঘাতী এবং কঠিন লড়াইয়ের অবসানের সূচনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৃহত্তম এই বড় সংঘাতের অবসানের জন্য আলোচনা চলছে এবং আমরা প্রতিদিন এর আরও কাছাকাছি আসছি। এই বিষয়ে আপনাদের মনোযোগের জন্য ধন্যবাদ!’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘রাশিয়ার এই উদযাপন বিজয় দিবসের জন্য, তবে একইভাবে এটি ইউক্রেনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারাও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি বড় অংশ এবং চালিকাশক্তি ছিল। এই যুদ্ধবিরতির সময়ে সব ধরনের সামরিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকবে এবং উভয় দেশ থেকে ১ হাজার করে মোট ২ হাজার বন্দি বিনিময় করা হবে।’
ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করা ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনি প্রচারণার অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। এমনকি তিনি এমন দাবিও করেছিলেন, ক্ষমতায় ফেরার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তিনি এ সংঘাত মিটিয়ে দেবেন।
তবে প্রায় দেড় বছর কেটে গেলেও ওয়াশিংটন এক্ষেত্রে বড় সাফল্য পেতে হিমশিম খাচ্ছে। রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন যুদ্ধ বন্ধে তেমন কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এই সংঘাত এখন একটি ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে পরিণত হয়েছে, যেখানে পুতিন বিশ্বাস করেন যে, বিশাল সামরিক বাহিনীর কারণে শেষ পর্যন্ত রাশিয়াই জয়ী হবে।
স্থবির হয়ে পড়া শান্তি আলোচনার সর্বশেষ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউক্রেনের পূর্ব দোনেৎস্ক অঞ্চল। এই অঞ্চলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এখন রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে।
মস্কো দাবি করেছে, দোনেৎস্কের যেসব অংশ রুশ বাহিনী এখনও দখল করতে পারেনি, সেখান থেকে ইউক্রেনীয় সেনাদের সরিয়ে নিতে হবে। তবে ইউক্রেন এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কোনো ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে রাজি নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।
২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত মিনস্ক চুক্তির শর্ত মেনে কৃষ্ণ সাগরের উপদ্বীপ ক্রিমিয়াকে রুশ ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য ইউক্রেনের তদবিরের জেরে কয়েক বছর ধরে টানাপোড়েন চলার পর ২০২২ সালে ইউক্রেনে বিশেষ সামরিক অভিযান শুরু করে রুশ বাহিনী। গত চার বছরেরও বেশি সময় ধরে সেই অভিযান চলছে।
জেলেনস্কি বারবার যেকোনো শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে ইউক্রেনের ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার ধারণা প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। তবে ট্রাম্প ও কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো এর আগে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে হলে ইউক্রেনের সামনে হয়ত শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো পথ খোলা থাকবে না।